সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ০৮:৩৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
কুমারখালী উপজেলা ও পৌর বিএনপির প্রতীকী অনশন পালন কুষ্টিয়ায় পণ্যে পাটজাতদ্রব্য ব্যবহার না করার অপরাধে জরিমানা কিশোরগঞ্জে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ২৫টি পরিবারের ৮৩টি বসতঘর পুড়ে ভস্মীভ’ত কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বিএনপির প্রতিকী অনশন পালিত কুষ্টিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে গাঁজাসহ ২ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে জনগনকে জনসম্পদে পরিনত করতে হবে : ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ, এমপি ফতুল্লায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় তালিকা হচ্ছে না নিয়ন্ত্রণহীন অপরাধীরা সাংবাদিকদের মধ্যে আর কোনো বিভক্তি থাকবে না : রুহুল আমিন গাজী কুষ্টিয়ায় তিন দিনেও খোঁজ মেলেনি অপহৃত মাদ্রাসা ছাত্রের, ফোনে মুক্তিপণ দাবি

পুড়ে অঙ্গার ৪০ যাত্রী ॥ নিখোঁজ অর্ধ শতাধিক

ঢাকা অফিস / ৭২ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ০৮:৩৩ অপরাহ্ন

মধ্যরাতে চলন্ত লঞ্চে ভয়াবহ আগুন

 

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে পুড়ে লঞ্চের ৪০ জন যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ আছেন অর্ধ শতাধিক যাত্রী। বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে গাবখান দপদপিয়া এলাকায় লঞ্চটিতে এ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। মৃত্যুর ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন। লঞ্চের ভেতরে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে নিহতদের স্বজনদের পরিবারে শোকের মাতম বইছে। প্রিয়জনের লাশের খোঁজে বহু মানুষ সুগন্ধা নদীর তীরে ভিড় করছেন। সেখানে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠছে নদীপাড়ের বাতাস। নিখোঁজদের সন্ধানে তারা হাসপাতাল ও নদীর পাড়ে বিভিন্ন স্থানে ছুটোছুটি করছেন। নিহতদের লাশ বরগুনায় পৌঁঁছলে সেখানে শোকাচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়। আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন মালদ্বীপে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শুক্রবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব এম এম ইমরুল কায়েস এই তথ্য জানিয়েছেন। এছাড়া নিহতদের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি। জানা গেছে, অভিযান-১০ লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর দপদপিয়া এলাকায় পৌঁছালে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ইঞ্জিন কক্ষে আগুন লাগে। পরে লঞ্চটি সদর উপজেলার দিয়াকুল এলাকায় গিয়ে নদীর তীরে নোঙর করে। খবর পেয়ে ঝালকাঠির ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরই মধ্যে দগ্ধ যাত্রীদের উদ্ধার করে ঝালকাঠির বিভিন্ন হাসপাতাল ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কাজে সহযোগিতা করছেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা লঞ্চ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানান, ঢাকা থেকে পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে বরগুনা যাচ্ছিল এমভি অভিযান-১০ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চটি। রাতে ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আগুন লেগে শতাধিক যাত্রী দগ্ধ হয়। ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মঈনুল হক জানান, ভোর ৫টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। যাত্রীদের উদ্ধারে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছেন। দগ্ধ যাত্রীদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঢাকার সদরঘাটে কর্মরত বিআইডব্লিউটিএ এর পরিবহন পরিদর্শক দিনেশ কুমার সাহা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রায় চারশ যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায়। চাঁদপুর ও বরিশাল টার্মিনালে লঞ্চটি থামে এবং যাত্রী উঠা-নামা করে। তবে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলেছেন, তিন তলা ওই লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের সময় হাজারখানেক যাত্রী ছিলেন। ঝালকাঠির গাবখানের কাছাকাছি সুগন্ধা নদীতে থাকা অবস্থায় রাত ৩টার পর লঞ্চে আগুন ধরে যায়। পরে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের দিয়াকুল এলাকায় নদীর তীরে লঞ্চটি ভেড়ানো হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা ওই লঞ্চ থেকে প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন যাত্রীদের অনেকে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাও সেখানে যান। ট্রলার নিয়ে লঞ্চের আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন তারা। ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, রাত ৩টা ২৮মিনিটে তাদের কাছে অগ্নিকাণ্ডের খবর আসে। তাদের কর্মীরা ৩টা ৫০ মিনিটে সেখানে পৌঁছে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন বরিশাল বিভাগীয় উপ পরিচালক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের চেষ্টায় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা, কোস্ট গার্ড ও পুলিশ সদস্যরাও উদ্ধার অভিযানে সহযোগিতা করেন। ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেছেন যেখানে লঞ্চটিতে আগুন লেগেছে, ওই এলাকা ঝালকাঠি লঞ্চঘাট থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে। লঞ্চের ইঞ্জিনরুমের অংশটি বেশি পুড়েছে। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তারা। ওই লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রী আব্দুর রহিম জানান, রাতে ডেক থেকে তিনি হঠাৎ বিকট শব্দ পান। তারপর লঞ্চের পেছন দিক থেকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে দেখেন। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন পুরো লঞ্চ গ্রাস করে ফেলে। আতঙ্কিত হয়ে তিনি ডেক থেকে নদীতে লাফিয়ে পড়েন। দিয়াকুল গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়ে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছিলেন। তারাই রহিমকে উদ্ধার করে গরম কাপড় দেন। পরে সকালে তাকে ট্রলারে করে ঝলাকাঠি শহরে নেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে ৭০ জনকে বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় জানিয়ে পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে বার্ন ইউনিট বন্ধ। যারা এসেছেন তাদের অনেকেই দগ্ধ হয়েছেন। ৬৭ জনকে সার্জারি ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক হাম জালাল বলেন, লঞ্চের কেরানী আনোয়ার ভোর রাত ৩টার ৫মিনিটে তাকে ফোন করে আগুন লাগার খবর দেন। সে বলেছে দোতলায় একটা বিস্ফোরণ হয়, সঙ্গে সঙ্গে কেবিনে আর লঞ্চের পেছনের বিভিন্ন অংশে আগুন দেখা যায়। তারপর তৃতীয় তলার কেবিন ও নিচতলায় ছড়িয়ে পড়ে আগুন। হাম জালাল বলছেন, ওই লঞ্চে অন্তত ২১টি অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ছিল, কিন্তু এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে যে সময় পাওয়া পায়নি। একটি পাইপ গেছে ইঞ্জিন থেকে, সেখানে প্রথম বিস্ফোরণ হয় বলে আনোয়ার আমাকে জানিয়েছে। নদীপাড়ে কান্না-আহাজারি : এমভি অভিযান-১০-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে নদীপাড়ের বাতাস। অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দগ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে কারও কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের পর লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়েও কারও কারও মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই, মৃতের সংখ্যার সঠিক তথ্য উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত জানানো সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নদীর পাড়ে আর চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে আশঙ্কায় রয়েছেন লঞ্চযাত্রীদের অনেক স্বজন। প্রিয়জনের হদিস না পেয়ে দিগ্বিদিক ছুটছেন তারা। স্বজনেরা জানেন না, তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় ছয় মাসের সন্তানকে বাঁচাতে অন্য এক যাত্রীর কোলে দিয়েছিলেন এক মা। এখন তার আর সন্ধান মিলছে না। মিলবে কি না, তাও নিশ্চিত নন তিনি। তাই সন্তানের খোঁজে আশঙ্কায় আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। আশপাশের মানুষদের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে সেই মা বলছেন, যদি কেউ আমার সন্তানের খোঁজ পান, আমাকে একটু বলবেন প্লিজ। এদিকে, নদীতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে ডুবুরি দল। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয়রাও। তাঁরা বলছেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনা এর আগে দেখেননি তারা। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ বেশিরভাগ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে, সেখানে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা। হাসপাতালের বারান্দাসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছেন অনেক রোগী। চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে চিকিৎসকসহ হাসপাতালের কর্মীদের। তবুও সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া কিছু রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আগুন লাগার পরও এক ঘণ্টা চলে লঞ্চটি: লঞ্চে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পরও এক ঘণ্টা ধরে সেটি চলতে থাকে। মাঝে দুটি স্টপেজ থাকলেও লঞ্চটি থামানো হয়নি। গতকাল এ কথা জানিয়েছেন নৌপুলিশের বরিশাল জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। নৌপুলিশের কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অগ্নিদগ্ধ লঞ্চটির হাসপাতালে আহত যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইঞ্জিন রুম থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইঞ্জিন রুমের অপারেটর ইঞ্জিন রুমে ছিলেন না অথবা আগুন লাগার পরে তিনি পালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, রাত প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে লঞ্চটি যখন নলছিটি ক্রস করে তখন এর ইঞ্জিনে আগুন লাগে। কিন্তু লঞ্চটি নলছিটিতে স্টপেজ দেয়নি, এমনকি ঝালকাঠিতেও স্টপেজ দেয়নি। ইঞ্জিন রুমের ওপরে থাকেন লঞ্চের সারেং। ইঞ্জিন অপারেটর নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সারেং লঞ্চ থামাবেন না অথবা ঘাটে ভেড়াবেন না। ধারণা করা হচ্ছে লঞ্চের সারেং প্রথমে আগুন লাগার খবর জানতে পারেননি। এ কারণে আগুন লাগার একঘণ্টা ধরেও লঞ্চ চলতে থাকে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নৌপুলিশ এ ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত বা যাদের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো। নিহতের পরিবার পাবে দেড় লাখ টাকা: লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি। গতকাল দুপুরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লঞ্চের দগ্ধ যাত্রীদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান। নৌপ্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের হিসাবমতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পুড়ে যাওয়া লঞ্চে ৩৫০ জনের মতো যাত্রী ছিল। এর বেশি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে। এছাড়া লঞ্চের ফিটনেস ঠিক ছিল বলে জানতে পেরেছি। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা এখনই বলতে পারছি না। সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লঞ্চের ব্যবসা কারা করে আপনারা সবাই জানেন। শেখ হাসিনার পরিবার লঞ্চের ব্যবসা করে না। দগ্ধ ৪ জন শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে : সুগন্ধা নদীতে চলন্ত লঞ্চে আগুনের ঘটনায় দগ্ধ শিশুসহ চারজনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আনা হয়েছে। দগ্ধ এই চারজন হলেন- জেসমিন আক্তার (৩৫), তার ছেলে তানিম হাসান (০৮), বাচ্চু মিয়া (৫০) ও তার মেয়ে সাদিয়া (২০)। গতকাল বিকাল তিনটার পরে দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে দুজনকে ও পরে আরও দুজনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। দগ্ধ জেসমিন আক্তারের খালু আবুল হোসেন জানান, জেসমিনের স্বামী খলিলুর রহমান বরগুনায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। বৃহস্পতিবার রাতে ওই লঞ্চে জেসমিন ছেলে তানিম ও মেয়ে মাহিনুরকে নিয়ে স্বামীর কাছে যাচ্ছিলেন। এ সময় ঘটনাটি ঘটে। তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলেই মাহিনুর আগুনে পুড়ে মারা যায়। ছেলে-মেয়েদের দিয়ে জেসমিন কেরানীগঞ্জের সুবাড্ডা এলাকায় বসবাস করেন বলেও জানান তিনি। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল জানান, লঞ্চে আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজন এখানে এসেছেন। এদের মধ্যে জেসমিন আক্তারের শরীরের ১২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে ও তার ছেলে তানিম হাসানের ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক ও মায়ের অবস্থা শঙ্কামুক্ত নন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাদের দুজনকে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি দুজনের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি তিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, লঞ্চে আগুনের ঘটনায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্নে চারজন এসেছেন। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে লঞ্চে আগুনের ঘটনায় দগ্ধদের চিকিৎসা যেন ঠিকমতো হয় সেজন্য বরিশালে চিকিৎসক ও ওষুধ পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সন্ধ্যা ৬টার দিকে দগ্ধদের দেখতে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেসময় সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। ইঞ্জিন রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জেনেছি। সেখানে গ্যাসের সিলিন্ডারও ছিল। সস্ত্রীক তিনতলা থেকে লাফ দেন ইউএনও : ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মোহাম্মদ আল মুজাহিদ ও তার স্ত্রী। তবে তার স্ত্রীর পা ভেঙে গেছে। বর্তমানে তারা ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ইউএনও দম্পতি লঞ্চের ভিআইপি কেবিন নীলগিরির যাত্রী ছিলেন। ইউএনও জানান, ঢাকা থেকে অফিসিয়াল কাজ সেরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে বরগুনার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। রাত ৩টার দিকে লঞ্চের অন্য যাত্রীদের চিৎকারে তার ঘুম ভাঙে। এ সময় লঞ্চটি সুগন্ধা নদীর মাঝখানে অবস্থান করছিল। অনেকেই নদীতে লাফিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন লঞ্চ থেকে তারাও লাফ দিলে তৃতীয় তলা থেকে দোতলায় পড়ে যান। তখন তার স্ত্রী উম্মুল ওয়ারার ডান পা ভেঙে যায় এবং হাতেও প্রচণ্ড আঘাত পান। তিনি আরও জানান, লঞ্চে থাকা বৃদ্ধ এবং শিশুরাই বেশি হতাহত হয়েছেন। এছাড়া লঞ্চে অনেক নারী ছিলেন, যারা নদীতে লাফিয়ে পড়েছেন। এদিকে নিখোঁজ যাত্রীদের তথ্য দিতে পারছে না বরগুনা নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বেঁচে ফিরে আসা দৈনিক জনবাণী পত্রিকার বরগুনা প্রতিনিধি সাংবাদিক সানাউল্লাহ জানান, লঞ্চটি ঝালকাঠি টার্মিনালের কাছাকাছি পৌঁছলে ইঞ্জিনরুমে আগুন লেগে যায়। সেই আগুন মুহূর্তেই পুরো লঞ্চে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে তীরে উঠেছেন বলে জানান। সাংবাদিক সানাউল্লাহর পাশাপাশি এমভি অভিযান-১০ এর দুর্ঘটনার কবল থেকে বরগুনায় ফিরে এসেছেন শহরের ক্রোক এলাকার বাসিন্দা রাজু আহমেদ, ছেলে হৃদয় (১২), মিম (৫), স্ত্রী মমতাজ, শহরের কাঠপট্টি এলাকার ছেলে মীর ফাইয়াজ, বন্ধু আশিক আহমেদ, রাইসুল আকরামসহ অনেকে। বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাউনিয়া সিকদার বাড়ির রিনা বেগম (৩৮) ও তার মেয়ে লিমা (১৪) নিখোঁজ রয়েছেন। তবে লিমা বেগমের ছেলে কাউনিয়া এমদাদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র রনি (১৫) লঞ্চ থেকে লাভ দিয়ে পড়ে অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। বর্তমানে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়াও বরগুনার অধিকাংশ যাত্রীই বরগুনা সদর উপজেলার ফুলঝুরি, বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ী, বামনা উপজেলার রামনা, পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়াসহ বিভিন্ন এলাকার। এখনো অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। বর্তমানে ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ চালমান রয়েছে। উদ্ধার তৎপরতায় রয়েছেন- ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, ঝালকাঠি যুব সদস্য, কোস্টগার্ড ও পুলিশ সদস্যরা। তদন্ত কমিটি : সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি অভিযান-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব তোফায়েল ইসলামকে আহ্বায়ক করে মন্ত্রণালয়টির পক্ষ থেকে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আমিনুর রহমান কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করবেন। এ তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের একজন, নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের একজন, নৌপুলিশ, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের একজন করে প্রতিনিধি রয়েছেন। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্েয মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এর আগে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী আজ শুক্রবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। লঞ্চের অগ্নিকাণ্ড ষড়যন্ত্রমূলক, দাবি মালিকের : এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন নৌযানটির মালিক হামজালাল শেখ। গতকাল শুক্রবার দুপুরে তিনি বলেন, ‘কাউকে সন্দেহ করা যাবে না। কিন্তু অবশ্যই কোনো ষড়যন্ত্র আছে। ইঞ্জিনে আগুন লাগলে ইঞ্জিনরুম পুড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওপরে বা আগুন সামনে যাওয়ার কথা নয়। যে–ই ঘটাইছে দ্বিতীয় তলা থেকে, লঞ্চের মাঝখান থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটাইছে।’ অভিযান-১০ নামে এ লঞ্চের ইঞ্জিনরুমে তিনটি তেলের ট্যাংকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার লিটার তেল ছিল জানিয়ে হামজালাল শেখ বলেন, ‘সব আগুন নিভে যাওয়ার পরও তেল থাকার কারণে ইঞ্জিনরুমের আগুন আরও দুই ঘণ্টা জ্বলে। কিন্তু ইঞ্জিনরুমের আগুন সর্বোচ্চ দোতলা পর্যন্ত ওঠার কথা। এর ওপরে ওঠার কথা নয়। ইঞ্জিনরুমে অনেক সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। লঞ্চের লোকজন এসব আগুন নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। অনেক সময় ইঞ্জিনে বিস্ফোরণ ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়। কিন্তু কেবিন পর্যন্ত কখনো আগুন যায় না। এই প্রথম দেখলাম, আগুন কেবিন পর্যন্ত চলে গেল। কোন জায়গা থেকে গেল, কীভাবে গেল, একমাত্র আল্লাহ দেখছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর