মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

নারী পাচার : আইন প্রয়োগের আগে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে

ঢাকা অফিস / ৩৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

নারীপাচার রোধে আইন থাকলেও দেশে তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া এবং জনসচেতনতার অভাবে বছরের পর বছর ধরে পাচার হচ্ছে নারীরা। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে টিকটক ও বিগো লাইভে আকৃষ্ট করে কিংবা প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারীরা পাচার হচ্ছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সম্প্রতি ভারতে নিয়ে এক নারীকে নির্যাতন ও পাচারের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকজুড়ে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। পাচারের বিষয়টি সামনে আসার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। এর পরই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ভারতে নারীপাচার চক্রের কয়েকজন। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু ভারতেই পাঁচ শতাধিক নারী পাচার করা হয়। বিদেশে নারীপাচার ও নির্যাতন রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোসহ আইন মোতাবেক শাস্তি নিশ্চিত করা ও গণমাধ্যমে তা নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন এটা নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা সচেতনতামূলক লেখার পাশাপাশি টিভিতে নিয়মিত বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেন, সীমান্তে কড়া পাহারা বসাতে হবে। দেশের যুব সমাজের অবক্ষয় রোধে টিকটক, পাবজি, বিগো লাইভ বন্ধ করতে হবে। যুব সমাজের অবক্ষয় রোধে শুধু পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নয়, বরং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবাইকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। তবেই দেশের নারী নির্যাতন, পাচার ও যুব সমাজ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। টিকটক ও বিগো লাইভে আকৃষ্ট করে নারীপাচার এবং তা রোধের বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ জাগো নিউজকে বলেন, মানবপাচার রোধে দেশে যে আইন রয়েছে, সেখানে নারী পাচারের বিষয়টি উল্লেখ আছে। এ আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইনকে ফলো করে তৈরি করা হয়েছে। আইনটি অনেক বিস্তারিত, যদি সেটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয় তাহলে নারী পাচার রোধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘যখন কোনো ঘটনা ঘটে বা কোনো কিছু বেড়ে যায় তখন আইন অনুযায়ী সেটার কাজ হয়, রেজাল্টও আসে। আইন থাকাটা বড় প্রশ্ন নয়, বড় কথা হলো- আমাদের প্রিভেনশনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রিভেনশনে ইজ ভেরি ইম্পরট্যান্ট।’ ফাওজিয়া করিম আরও বলেন, টিকটক, বিগো লাইভ, লাইকিসহ কিছু মাধ্যমে ইনভল্ব (জড়িত) হচ্ছে কম বয়সী মেয়েরা। তারা যে প্রলুব্ধ হচ্ছে, তা থেকে তাদের বাঁচানোর জন্য অ্যাওয়ারনেস (সচেতনতা) তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে ওই মাধ্যমগুলোর ব্যাপারে ইনফরমেশন সঠিকভাবে আছে কি-না, সে ব্যাপারে তারা সচেতন কি-না তা ভাবতে হবে। তিনি মিডিয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘দেশে সরকারি ও বেসরকারি যেসব টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যম আছে সেখানে কোনো প্রচার-প্রচারণা আছে কি? কোনো চ্যানেলে নারী ও শিশু বিষয়ে কোনো প্রচার-প্রচারণা আছে কি? কোনো কনটিনিওয়াস অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম আছে কি? কিছুই নেই।’ তিনি বলেন, দেশে যেসব নিউজ পেপার আছে সেখানে কোনো একটি ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে, সেটা নিয়ে খুব কাভারেজ দেয়া হয়। মিডিয়ার তো আলাদা রেসপনসিবিলিটি আছে। নারীপাচার বা মানবপাচার যে হচ্ছে এটা নিয়ে তো পত্রিকায় ইনফরমেশন থাকে। মিডিয়ায় যেখানে অ্যাডভারটাইজমেনটের অর্থ আসছে সেগুলো ঠিকই ছাপাচ্ছে। কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো খবরে আসছে না। তিনি মিডিয়ার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, শুধু কেন নারীপাচারের কথা হবে। সম্পাদকরা চিন্তা করতে পারে, সমাজের যেকোনো বিষয় নিয়ে অ্যাওয়ারনেস তৈরি করব, আমরা সবার কাছে এ সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে দেব। আইনজীবী ফাওজিয়া করিম আরও বলেন, এছাড়া স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নারীপাচার রোধে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেরি-ফেরির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। যদিও স্কুলগুলোতে এখন পেন্ডামিক সিচুয়েশন (মহামারি পরিস্থিতি) চলছে, কিন্তু টিকটকের ইফেক্ট (প্রভাব) নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কি করেছে? স্কুলগুলোর অ্যাসেম্বলিতে ইস্যুভিত্তিক আলোচনা করা হোক। এসব আলোচনার একটা শব্দ যদি তরুণ-তরুণীদের কানে যায়, ওই শব্দই কিন্তু পরবর্তীতে কোনো কাজ করতে গেলে একটা রেড সিগনাল দেবে। যদিও আমরা এ রকম করি না। তিনি বলেন, আমরা এখন চিন্তা করছি, ইজি মানি এভরিথিংক। কার কাছ থেকে কীভাবে টাকা নেয়া যায়। একটা মেয়েকে ভয় দেখালে মেয়েরা ভয়ে অনেক কিছু করে। সিস্টেমটাকেই আমরা এমন কিছু দিচ্ছি যে, টিকটক, বিগো, পাবজি কেন যেকোনো খারাপ কাজই করবে। তিনি আরও বলেন, আইন দিয়ে কী হবে, সিস্টেমটাই তো ভালো না! আইন তো অপরাধ সংগঠনের পরে কিন্তু মেয়েটা তো চলে গেছে বা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যদিও আজকাল পুরুষরাও ধর্ষণের শিকার হন। আগে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। তারপর আইনের প্রয়োগ করতে হবে। টিকটক ও বিগো লাইভে নারীদের আকৃষ্ট করে পাচার এবং তা রোধের বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন জাগো নিউজকে বলেন, দেশে নারী পাচারের মাত্রা ভয়াবহ পরিস্থিতি ধারণ করেছে। নারীপাচার রোধে আইন তো আছেই, এ আইন প্রয়োগে আরও কঠিন হতে হবে। উদাহরণ তৈরির মতো শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। টিকটক, পাবজি ও বিগো লাইভসহ বিভিন্ন দিকে তরুণ সমাজ যে আকৃষ্ট হচ্ছে সেগুলোও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। শুধু ভারতেই প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী পাচারের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা তো আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে হচ্ছে। এগুলো আইন দিয়ে কাভার করা সম্ভব নয়। এই যে নারীদের যেকোনোভাবে প্রলুব্ধ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়, এগুলো শুধু সরকারের পুলিশ বিভাগ একা কাজ করলেই হবে না। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অন্যথায় সম্ভব নয়। ব্যারিস্টার সুমন বলেন, এছাড়া কাজের জন্য বিদেশে যেসব নারী সদস্যকে পাঠানো হচ্ছে, সেগুলো না জেনে, না বুঝে সাপ্লাই দেয়ার মতোই। আপনি জেনে-বুঝে যাবেন না, তাহলে তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হবেই। টিকটক ও বিগো লাইভে আকৃষ্ট করে নারীপাচার এবং তা রোধের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জাগো নিউজকে বলেন, নারীদের বিদেশে পাঠানোর আগে তাদের কী কাজে পাঠানো হচ্ছে তার সঠিক তথ্য এজেন্সিগুলো থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে ডাটা আকারে থাকতে হবে। বিদেশগামী নারীদের সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সরকারের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো নাগরিক যাতে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার নামে নিজেকে হত্যার পথ বেছে না নেন তার দিকে নজর দিতে হবে। সীমান্ত বা জল-স্থল ও আকাশ পথে নজরদারি বাড়াতে হবে। দেশের সীমানাগুলোতে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে, যেন কোনো নারী দেশের বাইরে পাচারের শিকার না হন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর