শনিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:১৭ অপরাহ্ন

করোনার বৃত্ত ভাঙার স্বপ্ন!

ঢাকা অফিস / ৫০ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৮:১৭ অপরাহ্ন

আগামী অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বেশ রকমের উচ্চাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটে করোনার ক্ষত বা প্রভাব নিয়ে খুব বেশি আলোকপাত করেননি অর্থমন্ত্রী। তবে তার প্রকাশ করা উচ্চাশায় মহামারীর ফলে অর্থনীতিতে সৃষ্ট বৃত্ত ভাঙার স্বপ্নই তিনি দেখছেন বলে মনে হয়েছে। সে স্বপ্ন তিনি বাস্তবে কতটা দৃশ্যমান করতে পারবেন সেটিই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। গতকাল জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর চলতি ২০২১ সালে শুধু আইটি সেক্টরে কর্মসংস্থান হবে ১০ লাখ মানুষের। অর্থমন্ত্রী ‘রঙিন চশমা’ দিয়ে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের এই হিসাব কষলেও কোভিডকালীন এই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কিভাবে অর্জিত হবে তা তিনি বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করেননি। ৭ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে কী পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার তার কোনো চিত্র বাজটে দেয়া হয়নি। প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ব্যক্তি বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। বিনিয়োগ না হবার কারণে ব্যাংকিং খাতে তারল্যের পরিমাণ ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো হন্যে হয়ে ঋণ দেয়ার লোক খুঁজছেন। কিন্তু কেউ টাকা ধার নিতে আসছেন না। ব্যবসায়ীরা যদি টাকা ধার না নেন, তাহলে শিল্প গড়ে উঠবে কিভাবে। আর শিল্প কারখানা না হলে কর্মসংস্থানও হবে না আর কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধিও আসবে না। এই বাজেটে গরিব মানুষ কী পেল। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বর্তমান সরকার দরিদ্র জনগণের অবস্থা উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রতিবছর বরাদ্দ বৃদ্ধি করে চলেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় খাতে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট এক লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। ’ মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বৃদ্ধি গত বছরের বাজেটে বৃদ্ধি চেয়ে এক শতাংশেরও কম হয়েছে। গত বছরের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছিল। আর জিডিপির অংশ হিসেবে যা ছিল ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এবার জিডিপির অংশ হিসেবে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। উল্লেখ্য, সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধ ও ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তির টাকাও রয়েছে। বাজেটে চলতি বছর আইটি সেক্টরে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। কিভাবে তা হবে তা বলা হয়নি, কোভিডের সময় আইটি খাত কত প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যানও দেয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেননি, গত এক বছর দেশে কোভিডের কারণে কত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বাজেট বক্তৃতায় এক কথায় স্বীকারই করা হয়নি, দেশের মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। কিন্তু গত মাসেই ব্র্যাক ও পিপিআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে করোনার কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে আড়াই কোটি। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম উল্লেখ করেছে, এ সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে সরকারি হিসাবে কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে তা উল্লেখ না করলেও বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৩ শতাংশে এবং অতি দরিদ্রের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু কত থেকে নামিয়ে আনা হবে তা হয়তো ‘মনের ভুলে’ বলা হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম! করোনার এই মহামারীর সময় সবাই আশা করেছিল, এবার হয়তো বরাদ্দ বাড়বে। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেও জিডিপির সাথে তুলনায় তা এখনো ১ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘কোভিড-১৯ মোকাবেলায় গৃহীত কার্যক্রমগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রস্তাব করছি, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।’ অর্থমন্ত্রী বলেননি, বরাদ্দ বাজেটের কত বা জিডিপি কত শতাংশ। হিসাব করে দেখা গেছে, আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। কিন্তু এই বরাদ্দ জিডিপির ২ ভাগে উন্নীত করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন অর্থনীতিবিদরা। কালো টাকা বৈধ করার অবারিত সুযোগ আর থাকছে না : আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার অবারিত সুযোগ আর বহাল থাকছে না। ফলে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার যেসব সুযোগ দেয়া হয়েছে সেগুলো এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ভোগ করতে পারবেন করদাতারা। অবারিত সুযোগ না রাখার জন্য অর্থমন্ত্রী একটি সাধুবাদ পেতে পারেন। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় গতকাল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়ার বিষয়ে কিছুই বলেননি। অর্থ বিলেও আয়কর আইনে এ সংক্রান্ত কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে চলতি অর্থবছরের বাজেটে জমি, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি নগদ অর্থ, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে সেটি এ বছরের ৩০ জুন শেষ হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জরিমানা দিয়ে ফ্ল্যাট, প্লট কিংবা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ বহাল থাকছে। বাজেটে দেশী শিল্পের সাথে বেশ কিছু কর রেয়াত দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তাও প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু এই করোনাকালীন সময়ে চিড়েচেপ্টা হয়ে যাওয়া মধ্যবিত্তদের কিছুটা স্বস্তি দেয়ার জন্য ব্যক্তি শ্রেণীর আয়করমুক্তির সীমা এবার আর বাড়ালেন না অর্থমন্ত্রী। নতুন অর্থবছরেও ব্যক্তি শ্রেণীর আয়করমুক্ত সীমা তিন লাখেই রাখা হয়েছে। কালোটাকায় শক্তিশালী শেয়ারবাজার : কালোটাকায় শেয়ারবাজার শক্তিশালী হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, এর ফলে পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, পুঁজিবাজারকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এক বছর লক-ইনসহ কিছু শর্ত সাপেক্ষে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের আওতায় ফেব্রুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত ৩১১ জন করদাতা পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগপূর্বক ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৮ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছেন। যার ফলে দেশের পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পুঁজিবাজার শক্তিশালী হয়েছে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। ঢাকার শেয়ারবাজারের সূচক ৩৯ মাস পর ছয় হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে গেছে। বাজেটের আকার : আগামী অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হয়েছে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এতে ঘাটতিই ধরা হয়েছে দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। জিডিপির অংশ হিসেবে যা ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া হবে ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে- এক লাখ আট হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেয়া হবে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে আরো ৩২ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির প্রাক্কলন করা হয়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে আদায় করা হবে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূতখাত থেকে পাওয়া যাবে ১৬ হাজার কোটি টাকা। আর কর ব্যতীত প্রাপ্তি খাতে ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর থেকে আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তার মধ্যে আয়কর খাত থেকে আসবে এক লাখ চার হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। মূল্য সংযোজন কর বাবদ পাওয়া যাবে এক লাখ ২৭ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। সম্পূরক শুল্ক থেকে আসবে ৫৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। আমদানি শুল্ক ৩৭ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা। রফতানি শুল্ক ৫৬ কোটি টাকা। আবগারি শুল্ক তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর বাবদ প্রাপ্তি ধরা হয়েছে এক হাজার ৫০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের এডিপি আকার ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। আর জিডিপি আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৫৬ হাজার চার কোটি টাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর