মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৬:০৭ অপরাহ্ন

অপ্রত্যাশিত অতিথি

শহিদুল ইসলাম লিটন / ১১৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ০৬:০৭ অপরাহ্ন

শহর থেকে কিছুটা দূরে ছোট্ট একটি গ্রাম, গ্রামের নাম রতনপুর, সেই গ্রামে বাস করে রমজান মিয়া। তার দুই মেয়ে, বড় মেয়ে মান্না, ছোট মেয়ের নাম পান্না। বড় মেয়ের বিয়ের দুই বছর পর রমজান মিয়া মারা যান। ছোট মেয়েকে নিয়ে রমজান মিয়ার স্ত্রী তারাবানু কোনক্রমে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত কাটান। পান্না যখন পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত তখন তার মা তারাবানু মৃত্যু বরণ করেন। তখন পান্নার একমাত্র আশ্রয় হয় তার বড় বোনের কাছে। ভগ্নিপতি সফর আলী ঢাকার একটি গার্মেন্টসে চাকুরী করেন, সফর আলীর সংসার খুব একটা স্বচ্ছল নয়, বিধায় সংসারে অভাব অনটন প্রায়ই লেগে থেকে, এমতাবস্থায় পান্নার আগমণে তাদেরকে যদিও বাড়তি একটু সমস্যায় পড়তে হয়, কিন্তু পান্না তাদের সংসারে ছেলে মেয়েদের সেবাযতœ, রান্না-বান্না অনেক কাজে সহযোগিতা করার ফলে পান্নার উপস্থিতি তাদের কাছে অসন্তুষ্টির কারণ
হিসেবে প্রতীয়মান হয়না। মান্না একদিন বিকাল বেলায় তার মাথায় কিছুটা ব্যাথা অনুভব করে, গভীর রাত্রিতে মাথার ব্যাথা প্রচন্ড আকার ধারণ করে। প্রচন্ড ব্যাথায় সে হাঁউমাঁউ করে চিৎকার করতে থাকে। অবুঝ দুটি সন্তান মায়ের মুখের দিকে থাকিয়ে তারাও কাঁদতে শুরু করে। পান্না বোনের এ অসহনীয় অবস্থা প্রত্য করে কি সিদ্ধান্ত নিবে সে কিছুই ভাবতে পারতেছেনা। বোনকে যে ডাক্তার দেখাবে বা হাসপাতালে নিয়ে যাবে তার কাছে যে কোনো টাকা পয়সা নেই। সফর আলীর ভাইয়ের স্ত্রীর কাছ থেকে সামান্য কটা টাকা নিয়ে সে বোনকে নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। আর্থিক দৈন্যতা আজ থাকে রুখতে পারেনি। অবুঝ দুটি শিশুর মমতাময় চাহনী আর রক্তের টান তার শূন্য হাতকে আজ করেছে ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, প্রেরণা যুগীয়েছে মনের শক্তি, সে দৃঢ় আশাবাদী বিধাতা তাকে নিরাশ করবেনা। তার দুটি হাত কখনো পাপ স্পর্শ করেনি, এই পবিত্র দুটি হাত তুলে মহান প্রভুর কাছে সে দয়া কামনা করে, সে একরকম রিক্ত
হস্তে বোনের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রওয়ানা দেয়। পথ আজ যত কঠিন হোক সে মনে করে বিধাতার দয়া অনন্ত অসীম। সে বোনকে প্রথমে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যায়, সেখানে ডাক্তার বোনকে দেখে চিকিৎসার স্বার্থে ভর্তি করার জন্য পরামর্শ দেন। সে বোনকে হাসপাতালের একটি বেডে ভর্তি করে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। কিছুণ পর ওয়ার্ডের ডাক্তার এসে মান্নাকে ভালোভাবে দেখে কিছু জরুরী ঔষধের ¯িপ পান্নার হাতে দেন। পান্না ¯িপ হাতে পেয়ে বারান্দায় এসে আকাশের পানে দুটি হাত তুলে মহান আলাহর কাছে তার মনের কাকুতি প্রকাশ করে, হে আলাহ মাটির পৃথিবী যখন প্রচন্ড উত্তপ্ত হয় তখন তোমার কাছে তার প্রাণকে শীতল করার জন্য বৃষ্টি বর্ষনের প্রার্থনা করে, তেমনি আমি আজ জলন্ত অঙ্গার হয়ে তোমার কাছে সাহায্য কামনা করছি, তুমি তোমার কুদরতি সাহায্য থেকে আমাকে সাহায্য কর। আমার প্রাণকে শীতল করে দাও হে প্রভু। অবুঝ দুটি শিশুর মুখে ফিরিয়ে দাও প্রাণবন্ত হাসি। তার এই কাকুতির দৃশ্যটি খুব কাছ থেকে অবলোকন করেন একজন নবীন ডাক্তার, তিনি মনে মনে ভাবেন এতো সুন্দর মেয়েটি, কত সুন্দর তার মায়াবী চেহারা হলুদ বর্ণ দুটি হাত থেকে যেনো সোনালি আলো ঝলমল করছে। ফুলের পাপঁড়ির মতো রাঙা দুটি ঠোঁট তার
খুব জানতে ইচ্ছে করে তার কি দুঃখ, তার মনের প্রকৃত আকাঙ্খা কি? ভয়শূন্য চিত্তে সে জানতে চায় প্রকৃত বিষয়, একটু অগ্রসর হয়ে সালাম জানিয়ে সে পান্নাকে বলে পীজ যদি কিছু মনে না করেন আপনাকে একটু জিজ্ঞেস করতে পারি? পান্না কোন কথা না বলে তার দুটি চোখের জলে স্নাত কাগজটুকু তার হাতে দিয়ে এক দৌড়ে বোনের শিওরের কাছে আসে। ডাক্তার ¯িপটুকু পড়ে তার আর বুঝতে কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। এই কাগজে কতটুকু অসহায়ত্ব বা দারিদ্রতা নিহিত আছে। সে পান্নার কাছে গিয়ে বলে আমার নাম হীরা আমি এই হাসপাতালের একজন নবীন ডাক্তার, আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আমি আপনার এই দুঃসময়ে পাশে থাকতে চাই। আপনার দুঃখের একটু শেয়ার নিতে চাই। এই বলে সে চলে যায়। কিছুণ পর ¯িপে লেখা সব ঔষধ নিয়ে সে হাজির হয়। ঔষধ সেবন করে মান্নার অবস্থা ক্রমান্বয়ে উন্নতির পথে আসে। ভগ্নিপতি সফর আলী স্ত্রীর অবস্থা খারাপ শুনে ছুটি নিয়ে স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে আসেন। সেই সুবাধে হিরার সাথে দেখা হয়। পান্না তার দুলাভাইয়ের সাথে হিরাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। সফর আলীর অনুপস্থিতে মান্নার
চিকিৎসার খরচ যে হিরা চালিয়ে নিয়েছে সে তাকে জানায়। পান্না সফর আলীকে বলে যে দুলাভাই এটা উনার ঔষধের মেমো। সফর আলী দুই হাজার টাকার ঔষধ ক্রয়ের মেমো দেখে তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি সারা মাসে আট হাজার টাকা বেতন পান। ঐ টাকা দিয়ে তিনি সারা মাসের খরছপাতি চালান। তার পকেটে মাত্র পাঁচশত টাকা, তিনি কি করবেন, পকেটে যে হাত ঢুকিয়েছেন সেই হাত দিয়ে যে টাকা বের হবে তাতো খুবই সামান্য। মনে মনে তিনি খুবই লজ্জিত কি করবেন, কিন্তু বিধাতা যার সহায় থাকেন তার সম্মান তিনি সর্বদা অুন্ন রাখেন। হিরা সাথে সাথে বাঁধা দিয়ে বলে না না টাকা লাগবে না। আমিতো শুধু কর্তব্য পালন করেছি, মানবিক কারণে ফেরত নেওয়ার জন্য নয়। সে পান্নার দুলাভাইয়ের সামনে পান্নাকে ডেকে এনে বলে পান্না আমি তোমাকে আবারও কিছু বিরক্ত করতে চাই। পান্না বলে ঠিকআছে বলুন। হীরা পান্নাকে বলে দেখ পান্না হিরা আর পান্না দুটি নামের মধ্যে রয়েছে যেমন সৌন্দর্যের মিল, তেমনি এই দুটি ধাতু পৃথিবীতে খুবই মূল্যবান। আমি এই পৃথিবীতে পুরুষ হয়ে জন্মেছি বিধায় আমাকে একদিন সংসার করতে হবে। কেমন হবে আমার জীবন সঙ্গীনি, আমি সর্বদা যেরকম প্রত্যাশা করতাম তার সবটুকু বৈশিষ্ট্য আমি তোমার মধ্যে পেয়েছি। তুমি অসাধারণ এবং মহৎ গুণের অধিকারী সত্যিই তুমি অপূর্ব এবং অনন্যা। তোমার রয়েছে নজরকাড়া মোহনীয় রূপ। দারিদ্রতা
যদিও তোমাদের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু ধরনী তোমাকে তার বুকে ধরে রেখেছে, অনুপম সৌন্দর্য সুষমায়, তুমি আমার কাছে পূর্ব এবং অতুলনীয়। মানুষের জীবনের কোন এক প্রান্তে বিধাতার অশেষ দয়ায় এমন কিছু শুভণ আসে যা ভাগ্যবানরাই শুধু উপহার হিসেবে প্রাপ্ত হয়। আজ আমি তোমাকে জীবন সঙ্গী বানাতে চাই, তোমার সঙ্গে গড়তে চাই আমার ভালোবাসার অটুট বন্ধন। পান্না মনে কর অপ্রত্যাশিত অতিথি হয়ে আমি এসেছি তোমার জীবনে পীজ দয়া করে সারাজীবন আমাকে তোমার বুকে ঠাই দিও, পরম মমতায় টেনে নিও তোমার বাহুবন্ধনে, আমাদের এই পবিত্র মিলনে ফুলেরা যেন পাপঁড়ি মেলে হাসে। আমাদের এই শুভণ যেন যুগযুগান্তর ধরে ইতিহাসের পাতায় চির অ¤ান হয়ে থাকে পবিত্র ভালোবাসার অমর কীর্তি হয়ে।
লেখক: শহিদুল ইসলাম লিটন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর