মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :

আজ মজলুম জননেতার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী

গ্রামের ডাক ডেস্ক / ১৩৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি রাজধানীর পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মওলানা ভাসানী নামে তিনি সাধারণ মানুষের আপনজনে পরিনত হয়েছিলেন। তিনি রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময় মাওপন্থী কম্যুনিস্ট তথা বামধারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।  তার অনুসারীরা এ জন্য তাকে ‘লাল মওলানা’ নামেও ডাকতেন। তিনি ব্রিটিশবিরোধী গণ-আন্দোলনের নায়ক। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান এবং ১৯৭১-এ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি যিনি এক অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন এদেশের নির্যাতিত নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের মুক্তির দিশারী।

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন আজ এই জননেতার মৃত্যুবার্ষিকী নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে পালন করছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, টাঙ্গাইলের সস্তোষে মাজার জিয়ারত, ভাসানীর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ইত্যাদি। রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মজলুম জননেতার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সব সময় ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন। জাতীয় সংকটে জনগণের পাশে থেকে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতেন।

তিনি বলেন, তার (ভাসানী) নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল সমাজে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ, কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ জনগণ। ‘তেভাগা’ ও ‘লাঙল যার জমি তার’ আন্দোলনসহ তিনি অধিকার বঞ্চিত অবহেলিত মেহনতি মানুষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম করে গেছেন। ক্ষমতার কাছে থাকলেও ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো আবিস্ট করতে পারেনি। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন নির্মোহ, অনাড়ম্বর ও অত্যন্ত সাদাসিধে একজন মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মওলানা ভাসানী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন কাজ করে গেছেন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধেদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার ও প্রতিবাদী। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর আদর্শিক ঐক্য ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, শোষণ, বঞ্চনাহীন, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। মওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধনগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাজী শরাফত আলী খান, মায়ের নাম মজিরন বিবি। মওলানা ভাসানী ১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন করেন। এখান  থেকে তার নাম রাখা হয় ‘ভাসানীর মওলানা’। এরপর থেকে তার নামের শেষে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা এবং পঞ্চাশের দশকেই নিশ্চিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের ‘ওয়ালাইকুমুসসালাম’ বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন।

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন বর্ণাঢ্য। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ১০ মাস কারাভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ পার্টি গঠন করলে ভাসানী সেই দলকে সংগঠিত করেন।  ১৯২৬ সালে আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯৪০ সালে তিনি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে মওলানা ভাসানী আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৫-৪৬ সালে আসাম জুড়ে ‘বাঙ্গাল খেদাও’ নামে দাঙ্গা চলাকালে বাঙালিদের রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯৪৭ সালে আসামে  গ্রেপ্তার হন।  ১৯৪৮ সালে মুক্তি পান। এরপর টাঙ্গাইলের সন্তোষে ফিরে আসেন।

১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগ দলের সদস্য হয়েও সরকারের সমালোচনা করায় মওলানা ভাসানীকে নানাভাবে হয়রানি হতে হয়।  শেষে মওলানা ভাসানী ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগের জনবিরোধী কার্যকলাপের ফলে মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলির রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। সারা দেশ থেকে প্রায় ৩০০ কর্মী সম্মেলনে যোগদান করেন।  পূর্ববঙ্গের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। মওলানা ভাসানী সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালের ২৪ জুন।

১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দিলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ১৪ অক্টোবর তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। ১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করেন এবং ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি কারাগার  থেকে মুক্তি পান। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ এর ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বার লাইব্রেরি হলে তার সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ মাস কারানির্যাতন ভোগ করেন। অবশ্য জনমতের চাপে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৫৩ সালের ৩ ডিসেম্বর কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনী মোর্চা গঠন করেন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে ২৩৭টির মধ্যে ২২৮টি আসন অর্জনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর ১৯৫৪ সালের ২৫ মে মওলানা ভাসানী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে যান এবং সেখানে বক্তব্য রাখেন। ১৯৫৪ সালের ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন জারি করে এবং মওলানা ভাসানীর দেশে প্রত্যাবর্তনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। ১১ মাস লন্ডন, বার্লিন, দিল্লী ও কলকাতায় অবস্থান করার পর তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে ১৯৫৫ সালের ২৫ এপ্রিল দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ রোধে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের দাবিতে ১৯৫৬ এর ৭ মে ঢাকায় অনশন শুরু করেন। সরকার দাবি মেনে নিলে ২৪ মে অনশন ভঙ্গ করেন।

১৯৫৭ এর ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারি হলে আইয়ুব খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ  ঘোষণা করেন। ১২ অক্টোবর মওলানা ভাসানীকে কুমুুদিনী হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকায় ৪ বছর ১০ মাস কারারুদ্ধ থাকেন। বন্দি অবস্থায়ও ১৯৬২-এর ২৬ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বন্যাদুর্গতদের সাহায্য ও পাটের ন্যায্যমূল্যসহ বিভিন্ন দাবিতে অনশন করেন। ৩ নভেম্বর মুক্তি পেয়ে ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট-এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হন।  ১৯৬৩ সালের মার্চে আইয়ুব খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের বিপ্লব দিবসে যোগদানের জন্য ঢাকা ত্যাগ করেন এবং চীনে সাত সপ্তাহ অবস্থান করেন।

১৯৬৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবিত করে দলের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই বছর ২১ জুলাই সম্মিলিত বিরোধীদল (কপ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালের ২২ জুন কেন্দ্রীয় সরকার রেডিও এবং টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ জারি করলে এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে ন্যাপ দ্বি-খণ্ডিত হলে চীনপন্থি ন্যাপের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে মওলানা ভাসানী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের মুক্তি দাবি করেন। ১৯৭০ সালের ৬ থেকে ৮ আগস্ট বন্যা সমস্যা সমাধানের দাবিতে অনশন পালন করেন। সাধারণ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১২ নভেম্বর (১৯৭০) পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড় হলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার জন্য ন্যাপ প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ এর মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।

জি/হিমেল

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর