বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
কুমারখালী উপজেলা ও পৌর বিএনপির প্রতীকী অনশন পালন কুষ্টিয়ায় পণ্যে পাটজাতদ্রব্য ব্যবহার না করার অপরাধে জরিমানা কিশোরগঞ্জে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ২৫টি পরিবারের ৮৩টি বসতঘর পুড়ে ভস্মীভ’ত কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় বিএনপির প্রতিকী অনশন পালিত কুষ্টিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে গাঁজাসহ ২ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে জনগনকে জনসম্পদে পরিনত করতে হবে : ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ, এমপি ফতুল্লায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় তালিকা হচ্ছে না নিয়ন্ত্রণহীন অপরাধীরা সাংবাদিকদের মধ্যে আর কোনো বিভক্তি থাকবে না : রুহুল আমিন গাজী কুষ্টিয়ায় তিন দিনেও খোঁজ মেলেনি অপহৃত মাদ্রাসা ছাত্রের, ফোনে মুক্তিপণ দাবি

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় তালিকা হচ্ছে না নিয়ন্ত্রণহীন অপরাধীরা

ঢাকা অফিস / ৫৯ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ০৩:৫৩ অপরাহ্ন

এক সময় ২১ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম শুনলে আঁতকে উঠতেন দেশের মানুষ। তারা দিনে-দুপুরে বিভিন্নজনের কাছে চাঁদা চেয়ে চিরকুট পাঠাত। চিঠির সঙ্গে অনেকের কাছে পাঠাত কাফনের কাপড়। অনেকেই নীরবে দাবিকৃত সেই চাঁদা দিতে হত। তাদের সন্ত্রাস, দখল, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, সন্ত্রাসী কর্মকাে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে বহু বছর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রণয়নের কথা শোনা যায়নি অথচ আগের চেয়ে অপরাধ বেড়ে গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের অঞ্চলভিক্তিক সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রণয়নের খবর মিডিয়ায় তেমন আসেনি। নতুন এ অপরাধীরা র‌্যাব-পুলিশের অচেনা। এদের মদদদাতা রাজনৈতিক দলের ক্যাডার মাস্তান। পাড়া-মহল্লায় অপরাধের হাতেখড়ি। খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাস্তানি, অপহরণ করে মুুক্তিপণ আদায়, অস্ত্রবাজি, মাদক ব্যবসা, রাজনৈতিক কিংবা দলীয় প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার সবকিছুতেই তাদের দাপট। মূলত রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ বিভিন্ন শহরে অঞ্চলভিক্তিক এই অপরাধীরা অপরাধ কাজে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই অপরাধীরা খুন-ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। এরাই মাদকের বড় কারবারি। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, বিশ্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ ছন্দ হারিয়েছে। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে জড়িয়ে সমাজের বদহজম হচ্ছে। সমাজে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক চরিত্র গঠন, মানবিক মূল্যবোধ শেখাচ্ছি না। অথচ মাদক, জমিজমা বিরোধ, বিদেশি অপসংস্কৃতি, উঠতি বয়সি ছেলেদের রাজনৈতিক ব্যবহার ইত্যাদির কারণে তরুণরা অপরাধে জড়াচ্ছে। এ অবস্থায় অপরাধ শুধু পুলিশ দিয়ে নিবৃত্ত করা যাবে না। এ জন্য নতুন আইন করতে হবে; আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে এবং সামাজিক এবং স্কুল-কলেজে মূল্যবোদের শিক্ষা জোরদার করতে হবে। বিজ্ঞানের বদৌলতে নতুন যুগে প্রবেশ করছি। এই যুগসন্ধিক্ষণ অতিক্রমের প্রস্তুতি না থাকায় সমাজ ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, এক সময় ছিল যারা প্রফেশনাল লোক ছিনতাই, চুরি থেকে অধিকাংশ অপরাধে জড়িত থাকত। পুলিশের কাছে তাদের নির্দিষ্ট তালিকাও থাকত। দ্রুত ব্যবস্থাও নেয়া সম্ভব হত। এখন অপরাধীদের ধরন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে এদের ধরতে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে। ২৫ মার্চ। রাজধানীর বুড়িগঙ্গার চীন মৈত্রী সেতুর পার হয়ে এসেছে একটি পিকনিকের গাড়ি। রিজার্ভ বাসের ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ালে ৫/৬ জন তরুণ বাসে ওঠার চেষ্টা করে। রিজার্ভ বাস বলার পর তারা উঠতে চায়। ততক্ষণে সিগন্যাল ওঠে যাওয়ায় বাস চলতে শুরু করে। সেখানেই ওই তরুণরা মোবাইলে ফোন করে দয়াগঞ্জ এলাকায় কয়েকজনকে খবর দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে বাস দয়াগঞ্জ পৌঁছালে ওই সব তরুণ বাস আটক করে জালানা-গ্লাস ভেঙে দেয়। অনতি দূরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেখা গেলেও তারা ছিল নীরব দর্শক। শুধু এই দফাগঞ্জের ঘটনা নয়; রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরের একই চিত্র। পাড়ায় মহল্লায় গড়ে উঠেছে অপরাধী বাহিনী। তারা এক মহল্লার থেকে অন্য মহল্লার অপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে অপরাধ ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেরই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপ গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক শেল্টার পাওয়ায় এরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ছাতার নিচে এ অপরাধীচক্র গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কাছে নেতারা এদের ব্যবহার করে থাকেন। আবার স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির সুবাধে ওইসব উঠতি অপরাধীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় হয়। ফলে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠা সন্ত্রাসী বাহিনী একের পর এক অপরাধ করলেও তারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্রাইম রিপোর্টার জানান, এক সময় ঢাকায় এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেছিল সন্ত্রাসী বাহিনী। আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, কালা জাহাঙ্গীর, খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয়, ফ্রিডম সোহেল, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন, খোরশেদ আলম রাসু, ইমাম হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, আব্দুল জব্বার মুন্না, কিলার আব্বাস, আরমান, পিচ্চি হেলাল, আগা শামীম, জাফর আহম্মেদ মানিক, টোকাই সাগর, মশিউর রহমান কচি, পিচ্চি হান্নান, সানজিদুল ইসলাম ইমন, জিসান, মশিউর রহমান। এদের নাম শুনলেই মানুষ ভয় করত। এদের অনেকেই মারা গেছে। কেউ বিদেশে পালিয়েছে। এরপরও আগে প্রতিটি থানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই এলাকার অপরাধীদের ছবি টানিয়ে রাখতেন; তালিকা প্রকাশ করতেন মিডিয়ায়। এখন সেসব দেখা যায় না। মূলত অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাওয়ায় থানা ভিক্তিক তালিকা হচ্ছে না। চট্টগ্রামে অচেনা অপরাধীদের দাপট : রফিকুল ইসলাম সেলিম জানান, চট্টগ্রামে পাল্টে গেছে অপরাধের ধরন। অপরাধীরাও নতুন, র‌্যাব-পুলিশের অচেনা। বেশিরভাগ কিশোর তরুণ। খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাস্তানি, অপহরণ করে মুুক্তিপণ আদায়, অস্ত্রবাজি, মাদক ব্যবসা, রাজনৈতিক কিংবা দলীয় প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার সবকিছুতেই তাদের দাপট। এক থেকে দেড় দশক আগেও মহানগরী এবং জেলায় এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী গ্রুপের অপতৎপরতা ছিল। এক একটি এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নানা অপকর্ম করত তারা। এখন আর এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী বাহিনী নেই। তবে তাদের স্থান যারা দখল করেছে তারা আরো বেশি ভয়ঙ্কর। কারণ আগের সন্ত্রাসীরা ছিল পুলিশের তালিকাভুক্ত। কোনো অপরাধ সংগঠিত হলেই পুলিশ ওই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মাঠে নামত। আগাম ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ তাদের দৌড়ের ওপর রাখত। এখন যারা অপরাধ করছে তাদের বেশিরভাগই অচেনা। তাদের নাম-ঠিকানা পুলিশের খাতায় নেই। কেবল কোনো অপরাধের পর ধরা পড়লেই পুলিশ তাদের চিনতে পারছে। এতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। চট্টগ্রাম মহানগর এবং জেলায় এখন এসব কিশোর গ্যাং সদস্য উঠতি সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া তা ব চলছে। পাড়া-মহল্লায় মারামারি, সংঘাত-সহিংসতার পাশাপাশি ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি দস্যুতায়ও তারা জড়িয়ে পড়ছে। তাতে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। মাহে রমজান এবং ঈদ সামনে রেখে এসব অপরাধীদের অপতৎপতরা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং তা ধরে রাখতে পুলিশ বাহিনী সতর্ক রয়েছে। চট্টগ্রামে গত কয়েক বছর ধরে কিশোর অপরাধীদের দাপট চলছে। খুন, ধর্ষণ, সংঘাত-সহিংসতাসহ সব ধরনের অপরাধে উঠতি বয়সিরা জড়িয়ে পড়ছে। ভয়ঙ্কর অপরাধী এবং একসময়ে পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত দাগি সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে তাদের মদত দিচ্ছে। মূলত নিজেদের অপরাধের জগত ধরে রাখতে নবীনদের ব্যবহার করা হচ্ছে। নানা প্রলোভনে বিপথগামী হচ্ছে বিত্তশালী এবং উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরাও। নগরীতে এমন অপরাধীদের প্রকৃত সংখ্যা পুলিশের জানা নেই। তবে নগর পুলিশের পক্ষ থেকে একসময় নগরীর ৩০০ স্পটে বিচরণকারী অন্তত ৫৫০ জন কিশোর অপরাধীর তথ্য ছিল। পাড়া-মহল্লায় আড্ডাবাজির সাথে সাথে তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, ফেইসবুক-মোবাইল, প্রেম, চুরি-ছিনতাইসহ নানা ইস্যুতে সামান্য মতানৈক্য হলেই এদের মাথায় খুন চেপে বসে। তারা জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী সংঘাত-হানাহানিতে। নগরীর দুই থানার ওসির সাথে এ বিষয়ে কথা হয়। তারা জানান, এখন অপরাধের ধরন যেমন পাল্টে গেছে, তেমনি অপরাধীরাও নবীন। সব রকম অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া অধিকাংশ ছিনতাই মামলার বেশিরভাগ আসামিই কিশোর। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদককারবারেও এরা জড়িয়ে পড়ছে। সাইবার অপরাধেও আছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম প্রতারণায় জড়িত এসব উঠতি সন্ত্রাসীরা। খুন, চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিংসহ সব ধরনের অপরাধেই কিশোর অপরাধীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় সব মামলাতেই নবীন অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে। এরা বয়সে ছোট হলেও অপরাধে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। নেপথ্যে থেকে পাড়ার ক্যাডার, মাস্তান কিংবা রাজনৈতিক দলের থানা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার প্রায়ই দেখা যায়, অপরাধের কারণে কিশোরের শান্তি হলেও পর্দার আড়ালে থাকা সেই বড়ভাইয়েরা সহজে আইনের আওতায় আসে না। এর ফলে অপরাধও কমছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই ওসির ভাষ্য গডফাদারদের বেশিরভাগ সরকারি দলের হওয়ায় এসব অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর ইনকিলাবকে বলেন, ভাসমান এবং নতুন অপরাধী বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। কোন এলাকায় কারা কোন ধরনের অপরাধে জড়িত সে বিষয়েও পুলিশের কাছে তথ্য আছে। নতুন এবং ভাসমান অপরাধীদেরও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসে যাতে অপরাধীরা তৎপর হতে না পারে সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে আগাম ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। খুলনায় সন্ত্রাসী দল-উপদল : খুলনা ব্যুরো জানায়, দক্ষিণের সদা সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত খুলনায় কুখ্যাত এরশাদ শিকদারে মৃত্যুর পর জন্ম হয়েছে নতুন সন্ত্রাসীর। যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, সরকারি দলের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী দল-উপদল। হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি চলেছে ফ্রি স্টাইলে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা মহানগরী ও জেলায় সন্ত্রাসী দলগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে এখন ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় প্রভাবশালী নেতা। এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা। সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীতে কমপক্ষে ১৫ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন। তাদের ছত্রছায়ায় মোড়ে মোড়ে চলে মাদকের ব্যবসা। বিভিন্ন সরকারি টেন্ডারে ওই সব নেতাদের নির্দেশে দলের সন্ত্রাসীরা অস্ত্র ও জনবল প্রদর্শন করে থাকে। দলীয় মিছিল সমাবেশে এরাই অংশ নেয়। অন্যদিকে বিরোধী দলের বিভিন্ন মিছিল সমাবেশে সরকারি দলের পক্ষে তারাই শো ডাউন করে, বাঁধা দেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেএমপি’র একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন, খুলনার একজন সাবেক এমপির বিরুদ্ধে এক সময় সন্ত্রাসী কর্মকাে পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। মাদকের ব্যবসার সাথে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। খুলনা সদরের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, যিনি পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট আত্মীয়, তার বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাসের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যথাযথ প্রমাণ ও উপরের নির্দেশের অভাবে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। দিকে, নগরীতে কিশোর গ্যাং এর দৌরাত্ম বেড়ে গেছে মারাত্মকভাবে। গত দুই বছরে ৫টি খুন হয়েছে কিশোর গ্যাং এর অভ্যন্তীর দ্বন্দ্বে। কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্য মদদদাতা সরকারি দলের পদধারী কিছু নেতা। খালিশপুর অঞ্চলে এমন একজন নেতা নিজেকে একটি বিশেষ পরিবারের খুব কাছের মানুষ পরিচয় দিয়ে গত কয়েক বছরে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, খুলনায় সরকারি দলের একজন কেন্দ্রিয় নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা দৌলতপুর, খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা থানা এলাকায় টেন্ডারবাজি, বেসরকারি একাধিক জুটমিল, সরকারি ঘাট দখল করে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করতে পারেন না এলাকাবাসী। ওই কেন্দ্রীয় নেতার ছোটভাইও একটি সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। বছর দশেক আগে প্রায় নিঃস্ব এই ছোটভাই এখন দামি গাড়ি, বাড়ি ও বিপুল ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক। মহানগরীর পাশাপাশি জেলাতেও চলছে সরকারি দলের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী কর্মকা । খুলনার ৯ উপজেলায় মূল দল ও দলের অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মী মূলত মাদক, চোরাচালানের ব্যবসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। ডুমুরিয়া উপজেলায় কেন্দ্রীয় এক নেতা সরকারি জমি দখল করে গায়ের জোরে যেমন সরকারি জায়গায় ইটভাটা তৈরি করেছেন, তেমনি তার অনুসারীদের যাবতীয় অপকর্ম পুলিশকে চোখ বন্ধ করে সহ্য করে যেতে হচ্ছে চাকরি হারানোর ভয়ে। তেরখাদা উপজেলায় হত্যা, চাঁদাবাজির সাথে উপজেলার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা সরাসরি জড়িত রয়েছেন। অন্যদিকে, দু’দিন আগে কয়রা উপজেলায় গ্রেফতার হন একজন ইউপি চেয়ারম্যান। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের পদধারী একজন নেতা। এ বিষয়ে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ হারুন অর রশিদ বলেন, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। সন্ত্রাসীদের দলে স্থান নেই। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে দল সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। সিলেটে বাড়ছে অপরাধ : ফয়সাল আমীন জানান, সিলেটে উঠতি অপরাধীরাই নাড়িয়ে দিচ্ছে সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলার শেকড়। এদের কেউ কেউ চিনে কিশোর গ্যাং নামে। সেই কিশোর গ্যাংয়ের নৈপথ্যে রয়েছেন রাজনীতিক অনেক নেতা। তারা গ্রুপ রাজনীতির গুরু। গ্রুপ ভারী করে নিজদের বলয় ভারী করে রাখেন। এ অপরাধীরা চারিপাশে ঘিরে রাখে গ্রুপ রাজনীতির হোতাদের। মিছিলে সমাবেশ শক্তি যোগায়। কিন্তু কাজ শেষে ভয়ংকর অপরাধ করে আশ্রয় নেয় রাজনীতিক অভিভাবকদের। সেই অভিভাকরদেও মধ্যে রয়েছেন গ্রুপ রাজনীতিকদের উপ-গ্রুপের অনেক নেতা। পদ পদবী না থাকলেও এদের দাপট অনেক শক্তিশালী। সেই শক্তির ভারে উঠতি তরুণরা রাজনীতি ছত্রছায়ায় বেপরোয়া। যেন কোনো অপরাধ নেই তারা করছে না। চুরি, ছিনতাই, দখলবাজী, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজী, অস্ত্রবাজী, খুন সব কিছুতেই তারা জড়িত। তবে কিশোর বা তরুণ অপরাধীদের বেশিরভাগই ক্ষমতাশীন দলের ছায়াতলে আশ্রিত। চলমান রাজনীতির অস্থিরতায় তারা ভিড়ে গেছে শাসক দলে। নাম প্রকাশে একাধিক রাজনীতিক বলেন, এই সব অপরাধীরা সেলফি তুলে রাজনীতিক নেতাদের অভিভাবক লিখে পোষ্ট করে। সময় এমন এসেছে যে, রাজনীতিক নেতাদের অভিভাবক হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয় পরিবারের বাইরে। অথচ এক সময় অভিভাবক বলতে পরিবারের সদস্যদের বুঝানো হত। এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বারের সাবেক সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, ২০১৩ সালের শিশু আইনের অপব্যবহারে পার পাচ্ছে কিশোর বা তরুণ তথা নব্য অপরাধীরা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শিশু আইনের সংশোধনী হওয়া উচিত। সুশাসন না থাকায় জোর যার মল্লুক তার এমন মনোভাব তৈরি হয়েছে অপরাধীদের মধ্যে। অপরাধ কে, অপরাধ মনেই করছে না তারা। সূত্রমতে, সিলেট নগরীতে অপরাধপ্রবণ কিশোরদের সংঘবদ্ধ দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সন্ধ্যা নামলেই শহরটির অপেক্ষাকৃত জনবিরল জায়গাগুলোতে তারা দল বেঁধে অবস্থান নেয়; ছিনতাই, মাদক সেবন, মাদকদ্রব্য কেনাবেচা ইত্যাদি অপরাধ করে।এব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস) বি এম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, রমজানে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ। কমিউনিটি পুলিশ ও বিট পুলিশিং ব্যবস্থাকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যদিও কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা রয়েছে এসএমপির। এর বাইরেও অপরাধীদের নজরধারীতে রাখার সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন অপরাধীদের ধরন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। এলাকার বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধ চক্র গড়ে উঠেছে। ছোট ছোট বাহিনী আলাদা আলাদা করে অপরাধগুলো করছে। আবার সমস্যা দেখা দিলে মোবাইলে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এক হয়ে নিজেদের অপরাধের সমস্যা নিজেই করছে। যাদের চিহ্নিত করা অনেক সময় পুলিশের কঠিন হয়ে পড়ছে। এভাবে এলাকা অনুযায়ী পৃথক পৃথক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। এছাড়া রাস্তায় যত ছিনতাইসহ অপরাধের ঘটনা ঘটছে তাতে মাদকসেবীরা জড়িয়ে পড়ছে। মাদবসেবীরা রাস্তায় বসে ডান্ডি টানছে আবার সুযোগ পেলে ছিনতাইয়ে লিপ্ত হচ্ছে। যে কারণে আগের মতো কনক্রিট তালিকা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে পুলিশ বসে নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি আরো বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া আছে। আসন্ন রমজান মাসে চুরি-ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের ঘটনা যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেজন্য আগেই বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সকল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে, অভিভাবককে তাদের সন্তানকে সংশোধনের জন্য তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর