সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ০১:২৮ পূর্বাহ্ন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে পাঁচ সিদ্ধান্ত

অনলাইন ডেস্ক / ২৯ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ০১:২৮ পূর্বাহ্ন

স্কুল-কলেজ খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীসহ সব স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীকে করোনার টিকাদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশে অপরাধ বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়াসহ বাল্য বিবাহ বেড়েছে বলে মন্ত্রিসভার দু’জন সদস্য জানান।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের একটি বড় অংশের বয়স ৪০ বছরের নিচে হওয়ায় তাদের টিকার আওতায় নেয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে ভাবনায় পরেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গত সপ্তাহে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়’ অভিভাবকদের টিকাদানের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।ওই সভায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে পাঁচটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতকাল জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল সচিবালয়ে ‘কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ডিপ্লয়মেন্ট ও ব্যবস্থাপনা’বিষয়ক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, আপাতত ৪০ বছরের কম বয়সীদের টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভ্যাকসিন গ্রহণের বয়সসীমা ৪০ বছর নির্ধারণ করেছি, যদিও ভারতে ৬০ বা তার ঊর্ধ্বে লোকদের ভ্যাকসিন দিচ্ছে। আমাদের কাছে প্রস্তাব এসেছে বয়সসীমা কমিয়ে আনার, আমরা সেটা নিয়েও পরিকল্পনা করছি। তবে আমাদের যে বয়সসীমা দেয়া তাতে চার কোটি লোককে ভ্যাকসিন দিতে হবে। যদি বেশি ভ্যাকসিন আসে তাহলে বয়সের বিষয় চিন্তা করতে পারব। আমাদের টার্গেট দ্বিতীয় ডোজ যেন হাতে থাকে সেটা চিন্তা করেই কাজ করছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৫০ জন শিক্ষক টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। তাদের মধ্যে এক লাখ ৩৮ হাজার ৭২৪ জন টিকা নিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষক করোনার টিকা নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সরকার ৩০ মার্চ প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা এবং ২৪ মে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

অভিভাবকদের টিকাদান কীভাবে

২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার কার্যবিবরণী গতকাল ওই সভায় উপস্থিতি মন্ত্রী, সচিব ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়।

ওই সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে বিশবিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীসহ সব শিক্ষক-কর্মচারী এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের সহযোগিতায় টিকা প্রদান সম্পন্ন করা হবে।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই সভায় সরকারের রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক প্রফেসর ডা. তাহমিনা ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকরা স্কুলে আসা-যাওয়া করেন। কিন্তু অভিভাবকদের বয়স ৪০ বছরের নিচে হওয়াতে তাদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা যাবে না। ফলে এখানে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাসে এ সংক্রান্ত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) তারা তৈরি করেছেন। এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।’

স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’র বিষয়ে ডা. তাহমিনা ইসলাম বলেন, ‘এটা মূলত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার একটি নীতিমালা। কীভাবে স্বাস্থ্য সচেতন থেকে সন্তানদের স্কুলে আনা-নেয়া করা যায় সে সর্ম্পকে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে।’

৪০ বছরের নিচের অভিভাবকদের টিকা কর্মসূচির আওতায় নেয়া হবে কীনা জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, ‘৪০ বছর না হলে তাদের কীভাবে ভ্যাকসিন দেব? তাদের ভ্যাকসিন না দিয়ে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়েই এসওপি প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।’

‘করোনা মোকাবিলায় গঠিত পরামর্শক কমিটি’র সভাপতি প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে শিক্ষক-কর্মচারীদের টিকা দেয়া, পাঁচ বছরের অধিক বয়সীদের মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, উপসর্গ থাকলে স্কুলে না আসা, স্কুলের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নপূর্বক তা নিয়মিত মনিটরিং করা, স্যানিটাইজার ও সোপ-ওয়াটারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাকরণ, সংক্রমণ হলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় দেয়া প্রয়োজন।’

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান যেভাবে

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মহাপরিচালক আলমগীর মুহাম্মদ মনসুরুল আলম আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় জানান, স্কুল খোলার প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকেই স্কুল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষকদের টিকা গ্রহণ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন স্কুলে আনা হবে। অন্যদের একদিন পরপর স্কুলে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ডিপিই মহাপরিচালক।

অপরাধ, ঝরেপড়া ও বাল্যবিবাহ বেড়েছে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অপরাধ বাড়ছে। বিশেষত কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া, অনেক শিক্ষার্র্থী হলে থেকে টিউশনি করে নিজেদের লেখাপড়ার খরচ চালাত- সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে বেকার হয়েছে।’ করোনা সংক্রমণ অনেক কমেছে উল্লেখ করে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বিষয়ে অভিমত দেন।

সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে ঝরে পড়াসহ বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। শিক্ষক-অভিভাবকরা পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে আগ্রহী।’

মাধ্যমিকে শ্রেণী কার্যক্রম যেভাবে

আন্তঃমন্ত্রনালয় সভায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানান, স্কুল খোলার পর দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ছয়দিন, নবম ও একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে দু’দিন এবং ৬ষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একদিন স্কুলে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম স্কুল খোলার পর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাঠকর্মী কর্তৃক নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের বিষয়ে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সচিবদের অনুরোধ জানান।

পাঁচ দফা সিদ্ধান্ত

১. আগামী ৩০ মার্চ সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি পর্যায়ের সব সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হবে।

২. স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীকে টিকা দেয়ার বিষয়টি আগামী ৩০ মার্চের আগেই সম্পন্ন করবে।

৩. কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার অথবা মেরামতের প্রয়োজন হলে তা ৩০ মার্চের আগেই সম্পন্ন করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গণপূর্ত অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার অথবা মেরামতের ব্যবস্থা করবে।

৪. মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করবেন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে চলার বিষয়টি মনিটরিং করবেন।

৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর এসএসসি শিক্ষার্থীদের ৬০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ৮০ কর্মদিবস পাঠদানপূর্বক সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেয়া হবে।

ডিসিদের পাঁচ নির্দেশনা

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩০ মার্চ খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তসহ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসকদের বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি হয়।

দেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ২৯ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা রয়েছে।

আগামী ৩০ মার্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হবে ২৪ মে। এর আগে ১৭ মে আবাসিক হল খুলে দেয়া হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর