রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

৪১৫ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে অবশেষে বন্ধ হলো কুষ্টিয়া সুগার মিল

ডেস্ক: / ২৩৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের শাসনামলে থাকাকালীন এ মিলটি লাভের মুখ দেখলেও পরবর্তীতে প্রতি বছরই লোকসান হতে থাকে। লোকসানের কারণে মিলটি ধ্বংসের পথে। অবশেষে বন্ধ হয়ে গেল মিলটি। ৪১৫ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে অবশেষে বন্ধ ঘোষণা করা হল কুষ্টিয়া সুগার মিলস (চিনি কল)। এরই প্রতিবাদে শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছে।
প্রতি মৌসুমে কোটি কোটি টাকা লোকসানের বোঝা ও নানা সংকটে চিনিকলটি পরিণত হয় অতি রুগ্ন শিল্পে। শুধুমাত্র ২০০১-০২ থেকে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত গত ১৯ বছরে দেশের বৃহত্তম এই চিনিকলটিতে লোকসান হয়েছে ৪১৫ কোটি টাকা।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৬১ সালে কুষ্টিয়া শহরে অদূরে জগতি নামক স্থানে ২২১.৪৬ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া চিনিকল। ১৯৬৫-৬৬ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এ মিলে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৬-৬৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় চিনি উৎপাদন।
মিলের অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি মৌসুমে চিনি উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও এ মিলে লাভের চেয়ে লোকসানই হয় বেশি। তবে ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে ২ কোটি ৬১ লাখ ও ৯৫-৯৬ অর্থ বছরে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা মিলে লাভ হয়। এছাড়া বিগত ২০০১-২০০২ থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছর পর্যন্ত
গত ১৯ বছরের হিসাবমতে লোকাসন হয়েছে ৪১৫ কোটি টাকা। মিলের ব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. খোরশেদ আলম খন্দকার গত ১৯ বছরে ক্রমাগত লোকসানের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
চালুর প্রথমদিকে মিলটি লাভজনক হলেও পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও মাথাভারী প্রশাসনসহ নানা কারণে ক্রমাগত লোকসানের ঊর্ধ্বগতিতে মিলটি এখন অতি রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে লোকসানের বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষিভিত্তিক একমাত্র এ প্রতিষ্ঠানটি পড়েছে চরম হুমকিতে। এ দৈন্যদশায় মিলটি ঝিমিয়ে পড়ার পাশাপাশি ৩০ কর্মকর্তাসহ ৮৯০ জন কর্মচারীর চাকরি এখন হুমকিতে। শ্রমিক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না ৫-৬ মাস।
কলটির প্রতিদিনের চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১৫’শ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক মাড়াই ক্ষমতা ১৫ হাজার মেট্রিক টন। মিল জোনের আওতায় আখ চাষ হচ্ছে ৪০ একর জমিতে।
এছাড়া বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় চাষি পর্যায়ে আখ চাষ হয়েছে ৭ হাজার ৯শ’ ৯৩ একর জমিতে। প্রতিমন ১৪০ টাকা দরে চাষিরা মিলে চাষ সরবরাহ করেন। কিন্তু বিক্রিত আখের দাম পরিশোধে দীর্ঘ সূত্রিতাসহ হয়রানি ও নানা জটিলতায় চাষি মিলে আখ সরবরাহে আগ্রহ হারায়। প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত মিলটি আধুনিকীকরণ (বিএমআরই) করা হয়নি। ফলে বহু পুরাতন যন্ত্রাংশে সজ্জিত কারখানা প্রতি মৌসুমেই যান্ত্রিক ত্রুটিসহ ব্রেক ডাউনে চিনি উৎপাদন ব্যাহত হয়।
এছাড়াও প্রতি মৌসুমে মিলে উৎপাদিত হাজার হাজার টন চিনি থাকে অবিক্রীত। আমদানিকৃত চিনির বাজার মূল্য কম হওয়ায় ডিলার ও ভোক্তারা দেশি চিনির পরিবর্তে কেমিক্যাল মিশ্রিত রিফাইন চিনির দিকেই বেশী ঝুঁকছেন। ফলে নানা সংকটে সম্ভাবনাময় এ মিলটি ঘুর দাঁড়াতে পারেনি।
১৯৬১ সালে স্থাপিত এই মিলটি নিয়মিত চিনি, চিটাগুড়, মন্ড ও জৈবসার উৎপাদন করে আসছিলো। প্রথম কয়েক বছর মিলটি লাভে থাকলেও একসময় মুখথুবড়ে পরে। ধারাবাহিক ভাবে লোকসানে চলে যায় মিলটি।
পাটকলের ধারাবাহিকতায় এবার লোকসানে থানা চিনিকল বন্ধ করতে সরকার একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করে। কমিটির দীর্ঘ যাচাই বাছাই শেষে কুষ্টিয়া সুগার মিল সহ মোট ৬ টি সুগার মিলকে সাময়িক বন্ধের ঘোষনা দেন। আগামী বছর আরো দুইটি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে অধিকতর পর্যবেক্ষণ করে কমিটি কোন মিন কে আবার চালুও করতে পারে বলে জানাগেছে।
ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠত চিনি শিল্প করপোরেশন যাত্রা শুরু হয়। দেশে শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থানের লক্ষে মিলগুলো প্রতিষ্ঠিত হলেও সময়ের পরিবর্তনে আজ রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে পড়েছে চিনি শিল্প। সরকারের সঠিক পদক্ষেপের অভাবে ১৫ টি চিনি কলের মধ্যে মাত্র একটি লাভের পথে, দুইটি কলের সক্ষমতা ৫০% এর উপরে আর বাকি গুলো পথ হারিয়ে মুখথুবরে পড়ে লাইফ সাপোর্টে আছে। সার্বিক উৎপাদন ক্ষমতা ও ব্যায় বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক দুর্নীতি সহ নানা কারনে মিলগুলোর লোকসান হয় প্রতিবছর। ধারাবাহিক লোকসানে সরকার ভর্তুকি দিতে দিতে হাপিয়ে উঠেছে। এ কারনে মিলগুলো নিয়ে সরকার নড়েচড়ে বসেছে। সরকার মিলগুলোর হিসাব নিকাশ করতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করে। ২০২০-২০২১ মাড়াই মৌসুমে এই কমিটির সুপারিস করে নয়(৯) টি মিল মাড়ায়ে থাকবে বাকী ছয়(৬) টি মিলে মাড়াই বন্ধ থাকবে। বন্ধ ৬ টির মধ্যে আছে কুষ্টিয়া সুগার মিল। তবে কমিটি সূত্রে জানা যায়, বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল গুলোর কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে চালু ৯ টি মিলে বদলি করা হবে আর কিছু নিজস্ব মিলেই থাকবে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের এক নেতা জানান, মিলটি বন্ধ না করে সঠিক তদারকি ও টাক্সফোর্স গঠন এবং দুর্নীতি বন্ধ করে মিলটি আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে।
কুষ্টিয়া সুগার মিল শ্রমিক নেতা সুমন বলেন, সরকার শ্রমিকদের কথা চিন্তা করলো না। কুষ্টিয়া সুগার মিলটি আমাদের রুটি রুজি। সরকার শুধু লোকশানের চিন্তা করলো কিন্তু শ্রমিকদের জীবনের কথা চিন্তা করলো না।
পুরাতন কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের শাসনামলে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে এ মিলটি লাভের মুখ দেখলেও পরবর্তীতে প্রতি বছরই লোকসান হতে থাকে। লোকসানের কারণে মিলটি ধ্বংসের পথে।
কুষ্টিয়ার সাধারন মানুষ মনে করেন, কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য ও একমাত্র ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সুগার মিলটি বন্ধ করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। সরকার চাইলেই লোকসান ঠেকাতে সক্ষম। মিলকে ১০০% দুর্নীতিমুক্ত করে পুরাতন যন্ত্রাংশ মেরামত করে মিলকে সম্পুর্ন আধুনিক করে পুনরায় চালু করতে হবে।
অনেকেই মন্তব্য করেন, সরকার বিদেশ থেকে চিনি আমদানী করায় দেশীয় উন্নত চিনি বেশি দামে ক্রেতারা ক্রয় করতে চায়না। ফলে দেশীয় শিল্প দিন দিন ধ্বংসের দিকেই চলে যায়।
সুগারের মিলের কর্মকর্তারা জানান, আমাদের দেশে ফ্রেস, মেঘনা, পারটেক্সসহ বিভিন্ন কোম্পানী বিদেশ থেকে নিম্নমানের কেমিক্যাল ক্রয় করে কেমিক্যাল চিনি তৈরী করে বাজারে কম দামে বিক্রি করে। এই চিনি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। অথচ দাম কম হওয়ায় ওই চিনি বেশী বিক্রি হয়। এতে করে দেশীও চিনি বিক্রি একবারই কমে যায়। ফলে দেশীয় চিনি শিল্প ধ্বংসের মুখে চলে যায়।
এদিকে চিনিকল বন্ধের প্রতিবাদে ৫ দফা দাবিতে কুষ্টিয়া চিনিকলে শ্রমিক-চাষীদেও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চিনিকলের পাশে বাইপাস সড়কে চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারি ইউনিয়ন, আখ চাষী কল্যান সমিতি ও রেনউইক যজ্ঞেশ^র শ্রমিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে এ মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, চলতি মাড়ই মৌসুমে দেশের ১৫টি চিনিকল একযোগে চালু করতে হবে, শ্রমিক কর্মচারিদের ৭ মাসের বেতন পরিশোধ করতে হবে, শ্রমিকদের গ্রাইচুটি পরিষোধ করতে হবে এবং আখচাষীদের বকেয়া পাওনা পরিষোধের দাবি জানান তারা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর