রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
সরকার লুটেরা অর্থনীতি চালু করেছে : মির্জা ফখরুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে রেখে জাতিকে মেরুদন্ডহীন করা হচ্ছে : ডা. জাফরুল্লাহ ধর্ষণের ভুক্তভোগীকে প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে : প্রধান বিচারপতি টিকা নিয়ে তলে তলে ষড়যন্ত্র করছে বিএনপি : তথ্যমন্ত্রী বিশ্বে ভিন্ন ধরনের ‘মহামারি’ আসছে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভবন নির্মাণে বৃক্ষ নিধন নামের অক্সিজেনের উপর কুঠারাঘাত ৫৩ দিন পর হাসপাতাল থেকে বাসায় খালেদা জিয়া কুষ্টিয়ায় ৩৫ পিচ টাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার করেছে পুলিশ ঈদের পর অনলাইন/স্বশরীরে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত ইবি’র দৌলতপুরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঘেঁষে অবৈধভাবে কাটা হচ্ছে বালু

পরশপাথর

নন্দিনী আরজু রুবী / ১৯৩ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন

এখান থেকে নদী দেখা যায়। শীর্ণজলধারা পদ্মার শাখা নদী, শহর থেকে একটু দূরে এটা ফুলতলি নামে পরিচিত। নির্জন, কোলাহল তেমন নেই। শুধু শুক্রবার ভিড় থাকে। শহুরে কোলাহল ছেড়ে এদিকে অনেকেই আসে বেড়াতে। সবুজ প্রকৃতি ধূধূ মাঠ আর বালিচর। শীত আসছে অতিথি পাখির ডাকে এলাকা মুখর হয়ে উঠবে।
দীনুর ছোট চায়ের দোকান, সাথে লাগোয়া খড়ের কুঁড়েঘর। সকালে নামাজ পড়ে উঠে দোকান খুলে ঝাড়ু দিয়ে উনুন ধরায়। ব্যস্ত হাতে আটা মাখে কেটলিতে পানি ফোটে। দীনু তড়ঘড়ি করে রুটি বানায়, কখনো সব্জি কখনো ডালের ঘুগনি। কিন্তু সবচেয়ে আগে সে গরম রুটি সেঁকে সব ফেলে ঘরে ছুটে যায়। বেশ কিছু ক্ষণ পরে এসে বাকি কাজ করে। সারাদিন যাহয় তাতে দীনুদের দু’জনের দিন ভালোই চলে যায়। দীনু যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তার চোখে মুখে তৃপ্তি, স্বর্গীয় দ্যুতি যেন ছিটকে পড়ে। দীনুর তিনকূলে কেউ নাই সেই কোন ছোট্ট বয়সে বাবা নিখোঁজ হয়েছে আর তাঁর কোন হদিস পাওয়া যায়নি। মা অনেক কষ্ট করে অন্যের বাড়িতে কাজ করে দীনুকে মানুষ করেছেন, দীনু ইন্টার পাশ করেছে। কিন্তু শহরে যায়নি মাকে ছেড়ে সে কোথায় যাবে না এটাই তার সিদ্ধান্ত। মায়ের বয়েস হয়েছে অসুস্থতায় চলচ্ছক্তি হীন। নিজে কিছু করার ক্ষমতা নাই। দীনু সকালে উঠে মায়ের কাপড় ধুয়ে পরিস্কার করে। দোকান খুলে রুটি বানিয়ে আগে মাকে খাওয়ায়। তারপরে তার অন্য কাজ। রোজকার রুটিন। দীনুর দোকান বছর দুই হলো ভালোই চলছে। রাস্তার ওপাশে বেশ বড় তিনতলা অট্টালিকা উঠেছে। সামনে বাগান ফুল গাছ আর অনেক জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সেই বাড়ির বাসিন্দা। আদতে এটা একটা বৃদ্ধাশ্রম। দুই সেক্টর একদিকে পুরুষ আর এক দিকে মহিলা।
রমিছা বেগম তিন তলায় থাকেন। বছর খানেক আগে তার পুত্রবধূ এখানে তাকে রেখে গেছেন। ছেলে বড় অফিসার বিদেশ গেছে, একমাত্র ছেলে। ধনী ঘরের মেয়ে রমিছা, বিয়ে হয়েছিলো ধনী পরিবারে। স্বামী বড় চাকুরী করতেন সেই সুবাদে ঢাকা শহরে বসবাস। আর বাড়ি করেছিলেন ঢাকাতেই।
হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে উনি মারা যান। রমিছা একা হাতে সব দিক সামলেছে। ছেলেকে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে বিয়ে দিয়েছে তার দু’জন নাতি নাতনি, ভরা সংসার। এক রাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সকালে উঠে নিজে আর হাঁটতে পারেন না। চিকিৎসা করিয়েছেন কিন্তু পুরাপুরি সুস্থ হতে পারেননি। বাম পাশ অসাড় হাঁটেন খুঁড়িয়ে।
ছেলের বিদেশ থেকে অফার আসে। উচ্চাভিলাষী ছেলে চলে যায়, ওখানে গিয়ে সেটেল্ড। বউমা তার বাচ্চা দুটো নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। যাওয়ার আগে রমিছা বেগমকে এই “পরিচর্যা” বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেছে। তার বিশাল বাড়ি এখন ভাড়া দেওয়া। সেই বাড়ির আয় থেকেই তার চিকিৎসা থাকা খাওয়ার ব্যয় চলে। ফুটফুটে বাচ্চা দুটোর জন্য তার বুকটা হাহাকার করে, নিজের ছেলেটা সেও ভুলে গেছে মা কে, কদাচিৎ ফোন করে। তবুও রমিছা বেগম আশায় থাকেন ফোনের।
প্রতিদিন রমিছা বেগম ফজরের নামাজ শেষে নিজের অথর্ব দেহটা কষ্টে টেনে এনে বসেন বারান্দার ইজি চেয়ারটায়। বসে তসবি পড়েন, দোয়া দরুদ পাঠ করেন। কোন কাজ নাই তার, সারাদিন শুয়ে-বসে কাটে। একটা ফোন আছে তার নিজের, সব সময় কাছে রাখেন যেন বাবাইয়ের ফোন মিস না হয়।
চোখে পাওয়ার চশমা তবুও কাছের জিনিস ভালো দেখতে পান না।
শুধু ফোন রিসিভ করতে পারেন, কল কয়েক বার করেছেন বিভিন্ন যায়গায় চলে গেছে রং নাম্বার বলে রেখে দিয়েছে। এটেনটেন্ড দের কাছেও চেয়েছে ছেলের নাম্বার কিন্তু কেউ আগ্রহ দেখায়নি।
রমিছা বেগমের কাজ সকালের এই সময়, বারান্দায় বসে থাকা। দূরে নদী ঝাপসা কুয়াশার মতো বিস্তৃত, রমিছা বেগমের চোখ কেবল শূন্যতায় হাতড়ায় ফেলে আসা দিন, এখন কেন যেন কান্না আর আসে না, পাথরের শুষ্কতা দুচোখে। দীনুর দোকানের দিকে চেয়ে বসে থাকেন। এখান থেকে দীনুর ঘরের দাওয়া দেখা যায়। দীনু ভোরে ঘর ঝাড়ু দেয় দাওয়ায় যতœ করে মাদুর বিছিয়ে তাতে কাঁথা বিছিয়ে মাকে পাঁজাকোলে এনে শুইয়ে দেয়, তার গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে কাপড় কাচে, আড়ে শুকোতে দিয়ে গোছল সেরে দোকান খোলে। মায়ের খাবার বানিয়ে এনে নিজে হাতে যতœ করে খাওয়ায়। রুগ্ন মা ছেলের কপালে চুম্বন করেন, এদৃশ্য রমিছা বেগম কে স্বর্গসুখ দেয় তার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সকালে এই দৃশ্য দেখার লোভ রমিছা বেগম ছাড়তে পারেন না, প্রতিদিন এক অদৃশ্য টান তাকে নিয়ে আসে বারান্দায়।
আজ দীনুর দোকানে কোন সাড়াশব্দ নাই দাওয়ায় কোন বিছানা নাই রমিছা বেগমের মনে উৎকন্ঠা, কী হলো! ভিতরে ভিতরে তিনি অস্থিরতা অনুভব করলেন।
এমন সময় দেখলেন দীনু কোথা থেকে একটা ভ্যান রিকশা এনে তাতে বিছানা করে মা কে কোলে করে এনে শুইয়ে দিলো। দীনু অঝোরে কাঁদছে নিজেই ভ্যান চালিয়ে মাকে কোথাও নিয়ে গেলো।
দু’দিন দীনুদের দেখা নাই দোকান বন্ধ রইলো।
রমিছা বেগম ছটফট করতে লাগলেন। তার খুব কষ্ট হচ্ছে, কেন? ওরা তো তার রক্তের কেউ নয় তবুও বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে রমিছার, অনেক দিন তিনি কাঁদেননি।
বুকে জমা অবহেলার জগদ্দল পাথর তার হৃদয় থেতলে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। আজ দীনু আর তার মায়ের জন্য সে কিছু করতে চায়। তার টাকার অভাব নাই কিন্তু অভাব আছে ভালোবাসা, মায়া, মমতার।
রমিছা এটেন্টেন্ড কে ডেকে পাঠালেন। বললেন “ দীনুর মায়ের কী খবর “ তিনি দীনুর মায়ের চিকিৎসা খরচ বহন করতে চান।
তিন দিন পর সেই আগের চিত্র। এখন দীনুর দুই-মা রমিছা বেগম কে সে মা বলে ডাকে। মাঝে মাঝে রমিছা বেগম কে দীনু ঘাড় তুলে বারান্দায় দেখে, চিৎকার করে মা বলে ডাকে। রমিছা বেগম স্মিত হেসে হাত নাড়েন, মনে মনে অনেক দোয়া করেন দীনুর জন্য। এমন সন্তান যেন ঘরে ঘরে জন্মে।
আজ রমিছার কষ্ট নাই নিজের ছেলের জন্য আফশোশ নাই, ফোনের জন্য সকাল বিকাল অপেক্ষা নাই।
তিনি প্রতিদিন দীনুর মায়ের যতœ দেখেন, তৃপ্তিতে বুক ভরে যায়।
দুই বছর পরে…
দীনু দু’হাত তুলে দোয়া করছে তার সামনে দুইটা কবর। একটা সাধারণ বাঁশের বেড়া দেওয়া তার পাশেই সুদৃশ্য মোজাইক পাথরে বাঁধানো রমিছা বেগমের কবর।
রমিছা বেগম মারা যাওয়ার পরে তার ছেলে বউমা এসেছিলো তারাই মায়ের কবর বাঁধিয়েছে।
দীনু দুই কবরেই গোলাপ চারা লাগিয়েছিলো। অনেক ফুল ফুটেছে, লাল গোলাপের গন্ধ চারিদিকে।
দীনু প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গোরস্থানে চলে আস। দুই মায়ের জন্য অনেক দোয়া করে।
অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে চোখ, মনে প্রশান্তির পরশ পায়।
ভোরের স্নিগ্ধ শীতল হাওয়া দীনুর বুকটা জুড়িয়ে দেয়। মেঠো পথের ধারে অনেক বুনোফুল ফুটে আছে। গাছে গাছে পাখিদের কলকাকলিতে মুখর দিনের শুরু। দীনু পিছন ফিরে চোখ মুছে হাঁটতে শুরু করে ।
তার মনে হয় সবখানে মায়ের আশিস ঝরে পড়ছে, ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা শিশির বিন্দুতে নরম সূর্যের আলো; দীনুর পা ভিজে যায়। সবাই অপেক্ষা করছে দোকানে চায়ের আশায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর